ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব

মন্দার শঙ্কায় ২ দিনে মার্কিন শেয়ারবাজারে ৫.৪ ট্রিলিয়ন ডলার উধাও

বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ওলটপালট করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশাল শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার ফলে মাত্র দুদিনে মার্কিন শেয়ারবাজার থেকে ৫ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার বা ৫ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার উধাও হয়েছে।

বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ওলটপালট করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশাল শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার ফলে মাত্র দুদিনে মার্কিন শেয়ারবাজার থেকে ৫ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার বা ৫ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার উধাও হয়েছে। চীন পাল্টা শুল্ক আরোপ করায় বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা এখন আরো গভীর।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের ফ্যাক্টসেটের তথ্যভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ঘোষণার পর শুক্রবার এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৬ শতাংশ হারে কমে গেছে। আগের দিনের ৪ দশমিক ৮ শতাংশ দরপতনের পর ঘটল এ ঘটনা। এতে মার্কেট মূল্য থেকে ৫ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার হারিয়ে গেছে। চলতি সপ্তাহে ব্লু-চিপ সূচকটি মোট ৯ দশমিক ১ শতাংশ হারে কমেছে, যা কভিড মহামারীর শুরুর পর থেকে সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতন।

অ্যাপল ও অ্যামাজনের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের শেয়ারদর কমে যাওয়ায় নাসডাক কম্পোজিট সূচক তার ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সর্বোচ্চ থেকে ২০ শতাংশের বেশি হারে কমেছে। সূচকটিকে ‘বিয়ার মার্কেট’-এর পর্যায়ে নিয়ে গেছে দরপতনের এ ঘটনা। অন্যদিকে ইউরোপের এসটিওএক্সএক্স ৬০০ সূচক সপ্তাহজুড়ে কমেছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, আর যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক পড়েছে ৭ শতাংশ। এমএসসিআইয়ের এশিয়া সূচক ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমে পায়। শেয়ার মার্কেটে এ বিশৃঙ্খলা তুলে ধরে যে ট্রাম্পের ঘোষিত ১০ শতাংশ সর্বজনীন শুল্ক ও আরো বেশি পরিমাণে পারস্পরিক শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কাঁপিয়ে দিয়েছে। এতে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে সৃষ্টি করেছে ধসের শঙ্কা।

বিশ্বের বৃহত্তম রফতানিকারক দেশ চীন শুক্রবার সব মার্কিন আমদানির ওপর ৩৪ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে এ অনিশ্চয়তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বার্কলেজের গবেষণা প্রধান অজয় রাজাধ্যক্ষ বলেন, ‘৯ এপ্রিলের মধ্যে এ পারস্পরিক শুল্ক প্রত্যাহার করা না হলে সম্ভবত আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে মন্দা দেখতে পাব। এ বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ না হলে আমরা মনে করি এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে মন্দা আসছে।’

ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ার জে পাওয়েল শুক্রবার সতর্ক করে বলেন, ‘ট্রাম্পের শুল্কনীতির ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধি দেখা দেবে। এখন স্পষ্ট হচ্ছে যে শুল্ক বৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বড় হবে। তাছাড়া অর্থনৈতিক প্রভাবও প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি হবে।’

পাওয়েলের ভাষণের আগেই ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ফেড চেয়ারকে সুদহার কমানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘‌এখন সুদহার কমানোর জন্য একেবারে উপযুক্ত সময়।’ মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের পাল্টা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘‌আতঙ্কিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে চীন।’

বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়া ট্রাম্প অবশ্য মার্কিন শেয়ারবাজারের পতন নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ধৈর্য ধরুন। আমরা হারতে পারি না।’

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এসব মন্তব্য বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। বরং আর্থিক পূর্বাভাস আরো খারাপের দিকে গেছে। জেপি মর্গান শুক্রবার তাদের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস সংকোচন করে জানায়, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দশমিক ৩ শতাংশ হারে সংকুচিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেপি মর্গান আগে ১ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অনুমান করেছিল। ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকটি আরো জানায়, অর্থনৈতিক কার্যকলাপের মন্দা বেকারত্বের হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশে নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সিটিগ্রুপ তাদের পূর্বাভাসে ২০২৫ সালের প্রবৃদ্ধি দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ১ শতাংশ করেছে। তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখন কভিড-পরবর্তী সময়ের চেয়েও বেশি। একটি আধুনিক উন্নত অর্থনীতি কখনো এত দ্রুত বা বড় আকারে শুল্ক বৃদ্ধি করেনি।

বাজারে বিদ্যমান এ বিরূপ মনোভাব মার্চের শক্তিশালী কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের সঙ্গে তীব্রভাবে সাংঘর্ষিক। শুক্রবার সকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি চাকরি নতুন করে যুক্ত হয়েছে এবং বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ।

তবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তারা কম রেটিংপ্রাপ্ত মার্কিন করপোরেট বন্ড ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে বেরিয়ে এসে ট্রেজারি বন্ডের মতো নিরাপদ আশ্রয়ে গেছে। এদিকে বাজার অস্থিরতায় হেজ ফান্ডগুলোকে অতিরিক্ত নগদ জমা দিতে ব্যাংকগুলো চাপ দিতে শুরু করেছে। ফিনটেক কোম্পানি ক্লারনাসহ একাধিক কোম্পানি স্থগিত করেছে তাদের আইপিও পরিকল্পনা।

মার্কিন স্টকের ভবিষ্যৎ অস্থিরতা পরিমাপ করা ভিআইএক্স সূচকের ডাকনাম ‘ওয়াল স্ট্রিটের ভয় সূচক’—এটি ১৫ দশমিক ১ পয়েন্ট বেড়ে ৪৫ দশমিক ১-এ পৌঁছেছে, যা ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ। এ পতন ছড়িয়ে পড়েছে পণ্যবাজারেও। আন্তর্জাতিক তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড শুক্রবার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৬৫ দশমিক ৫৮ ডলারে, যা তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৬১ দশমিক ৯৯ ডলারে নেমেছে, যা অনেক শেল প্রডিউসারদের ব্রেক-ইভেন পয়েন্টেরও নিচে। শিল্প পরিস্থিতির অবস্থা নিরূপণে ব্যবহৃত সূচক কপারের দাম যুক্তরাজ্যে প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে।

এ পতনের মাঝে কমেছে প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ওপর মুনাফা। এটি কমে ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার আগের সময়ের চেয়েও কম।

আরও